শৈশবে যৌন বিষয়ে শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা শৈশবে যৌন বিষয়ে শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা

শৈশবে যৌন বিষয়ে শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা

ব্রিটিশ জাদুঘরের প্রাচীন সংগ্রহশালার বিশেষ কক্ষে দাড়িয়ে আছি, সেখানে বিশ্বের বৃহত্তম জাদুঘরটির সর্বাপেক্ষা প্রাচীন বস্ত তাঞ্জানিয়ার আদিমানুষের ব্যবহার করা ১৮ লক্ষ বছরের প্রাচীন প্রস্তরকুঠার আছে, ইউরোপের প্রাচীন ফরাসীদের তৈরি ম্যামথের দাঁতের তৈরি ১৩,৫০০ বছর আগের অপূর্ব শিল্পকর্ম আছে, এমন অনেক কিছুরই মাঝে ছিল এগার হাজার বছর আগে তৈরি আইন শাখ্রির যুগল (Ain Sakhri lovers ) ভাস্কর্য, এখন পর্যন্ত আমাদের জানা মতে এটি বিশ্বের প্রাচীনতম যৌনক্রীড়ার ভাস্কর্য।

বেশ ভিড় সেটার সামনে, সবাই উঁকিঝুঁকি মেরে বোঝার চেষ্টা করছে যে আসলেই মানুষ দুইজন কী করছে। এমন সময় দেখি দুই পিচ্চি, বোঝা গেল ভাইবোন, মূর্তিটি দেখে অবিশ্বাসের স্বরে তাদের মাকে বলল- ১১,০০০ বছর আগের ভাস্কর্য এইটা! মা উল্টো প্রশ্ন করলেন, বলতো মানুষ ২টা কী করছে? বছর ছয়-সাতেকের পিচ্চি মেয়েটা মুখে আঙ্গুল পুরে মুহূর্তদুয়েক চিন্তা করে সুরেলা কণ্ঠে বলে উঠল- They are making babies !

lovers

lovers

( ছবিটি ব্রিটিশ জাদুঘরের ওয়েব পেজ থেকে নেওয়া)

তার মা বেশ খুশী হয়ে বললেন, বাহ, তুমি ধরতে পেরেছ! পরের প্রশ্ন করল ক্ষুদে দেবদূতটি, বেবী কোথায়? মা আবার উত্তর দিলেন- মায়ের গর্ভে, নির্দিষ্ট সময় পরে বাহির হবে, এই কয় মাস সে মায়ের পেটেই বেড়ে উঠবে।

তাদের কথোপকথনে আর মন নেই আমার, মনে পরে যাচ্ছে তার চেয়ে দ্বিগুণ বয়সেও বেবী কোথা থেকে আসে সেই রহস্যে হাবুডুবু খেয়েছি অসংখ্য দিনরাত্রি। শেষে স্কুলের বইতে আদিম মানুষের ছবি দেখিয়ে বড় ভাই বলেছিল সে নাকি ঐ আদিম মানুষ, বাবা-মা তাকে বন থেকে নিয়ে এসেছে সভ্য করবে বলে! আর আমি? কোত্থেকে এলাম? একবার শুনি আকাশ থেকে, একবার শুনি আল্লাহ দিয়েছি, আবার শুনি কুড়িয়ে পেয়েছে! আবার বন্ধুরাও একই কথা বলে! জীবন বড়ই জটিল দেখি!

সেবা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছিল বিদ্যুৎ মিত্র নামের আড়ালে স্বয়ং কাজী আনোয়ার হোসেনের লেখা অসাধারণ এক বই যৌনসঙ্গম, যদিও তা পরবর্তীতে যৌন বিষয়ে সাধারণ জ্ঞান নামে প্রকাশিত হয়, ফ্ল্যাপে লেখা ছিল কিশোরদের জন্য প্রকাশিত এক মনোরম সুখপাঠ্য বই। শুধু কিশোর কেন? কিশোরীদের জন্য কি ব্যাপারটা আলাদা? সেইখানে প্রাঞ্জল ভাষায় কাজীদা বলেছেন বইটি তিনি লিখেছেন বড় ছেলের জন্য, যৌনবিষয়ে সাধারণ বিষয়গুলো সেই সমাজে না জানার জন্য কৈশোর যেমন বিষময় হয়ে গিয়েছিল তার, যেন ছেলের ক্ষেত্রে তেমন না হয়, সে যেন স্বাভাবিক জ্ঞান এবং বোধ নিয়েই বেড়ে ওঠে সাবালকত্বের দিকে।

আমাদের রক্ষণশীল সমাজে সেক্সের মত অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে জানার উপায় মাত্র ২টি, অকালপক্ক গৃহকর্মী অথবা ইঁচড়েপাকা বন্ধুবান্ধব। এবং প্রায় ১০০% ক্ষেত্রেই তারা নিজেরাই জানে ভুল, যেহেতু শিখেছেই ভুল, তার সাথে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে আরেকটু রঙদার করে জানিয়ে দেয় নিজের বিশাল জ্ঞান- ভুলের পরিমাণ বাড়তেই থাকে জীবনের বেসিক একটি বিষয় নিয়ে। হয়ত পাড়ার মুদি দোকানদারের ছেলেটি নিজের সুবিশাল অভিজ্ঞতার ঝোলা খুলে ধরে মাঝে মাঝে কনডম বিক্রির সুবাদে, হয়ত পাড়ার বখাটে বড় ভাই অশ্লীল ভাবে কোন অভিজ্ঞতার কথা বলে চলে মুখে উদ্দামতা নিয়ে, হয়ত অসুস্থ কোন শিশুধর্ষকামীর হাতেই হয় এই ইন্সটিনক্টের হাতেখড়ি। ভুল সবই ভুল, তাহলে সঠিক পথে উত্তরণের উপায় কী?

শিক্ষা, একমাত্র বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা, যা স্কুলে শেখানো হবে বাল্যকালের প্রয়োজনীয় বয়সে।

আমাদের সময়ের স্কুলের সিলেবাসে প্রায় কিছুই ছিল না এই নিয়ে, জীববিজ্ঞানের বইতে ক্লাস নাইট বা টেনে যাওবা ছিল, ক্লাসে সেটা এড়িয়ে যাওয়া হত। এইভাবে হেঁজিপেঁজি করে যৌনতাকে এড়িয়ে যাবার কিছু নেই, এড়িয়ে যাওয়া যায়-ও না। অন্তত বয়ঃসন্ধির আগেই বা সময়কালেই শারীরিক পরিবর্তনগুলো কেন হচ্ছে এবং সেগুলো যে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক এবং শারীরিক সুস্থতারই পরিচায়ক তা বুঝিয়ে বলা উচিত নিজেদের মানসিক পীড়ন থেকে রক্ষা পাবার জন্য।

গার্হস্থ্যবিজ্ঞানের বইতে উঁকি দেবার সুযোগ তেমন হয় নি কো-এডুকেশন স্কুলে পড়া স্বত্বেও, বরং অন্যস্কুলের বড় ভাইরা সারাজীবন খুঁচিয়ে যেত- মেয়েদের সাথে ক্লাস করিস, খুব মজা না! মজার কী আছে! মেয়েদের সাথেই তো স্কুলে যাই, ক্লাস থ্রি পর্যন্ত একসাথে পড়লামও, টিফিনে চিল্লাপাল্লা করে লুকোচুরি খেললাম, এই নিয়ে অন্যরা ভেংচি কাটে কেন কে জানে! কিন্তু এখন জানি কেন তারা এমন মন্তব্য করত, যেহেতু আমাদের সমাজে ছেলেমেয়ের বন্ধুর হবার বা মেলামেশার সম্ভাবনা সবসময়ই খুব কম থাকে, অনেকটা বঞ্চনা থেকে, হয়ত ক্ষোভ থেকে, হয়ত ফ্রয়েডীয় দুঃখবোধ থেকেই এই ধরনের কথাগুলো আসে।

যাই হোক, শুনেছি মেয়েদের শরীরের অন্যতম স্বাভাবিক জিনিস, শারীরিক সুস্থতার পরিচায়ক পিরিয়ডকে অনেক জায়গাতেই আবছা ভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, এটি কেন হয়, কিভাবে হয়, হলে কী করা উচিত সেগুলোর বিস্তৃত ব্যাখ্যাতে না যেয়ে একাধিক বইতে এমন উল্লেখও দেখেছি যে একে এক ধরনের অসুস্থতা বলেই দেখানো হয়েছে, এই সময়ে মেয়েরা যেন বাড়ীতেই থাকে, এটা না করে, সেটা না ধরে এমন ধারণাই চলে এসেছে অনেক দিন।

ধর্মবিষয়ক নানা বইতেও দেখেছি সরাসরি বলে হয়েছে পিরিয়ড বা ঋতুচক্র চলার সময়কে অপবিত্র কাল বলে সেই সময়ে সঙ্গমকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, শরীর থেকে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় বেরিয়া যাওয়া রক্তকে খারাপ রক্ত বা অপবিত্র রক্ত বলা হয়েছে ( বাচ্চা গর্ভে থাকা অবস্থায় নারীর ঋতু বন্ধ থাকে দীর্ঘ সময়টুকু, সেই রক্ত দিয়ে বেড়ে ওঠে, পুষ্ট হয় গর্ভস্থ ভ্রূণ, জগতের সব মানুষই সেই তথাকথিত অপবিত্র রক্তের তৈরি তাহলে! এই ভ্রান্তিটুকু কেন যে কোন শিক্ষক অভিজ্ঞতা বা বইয়ের সাহায্যে ভেঙ্গে দেন নি তা এক অপার রহস্য!)

গত মাসে এক ইরানি কিশোরী এসেছিল ফিনল্যান্ডের বাসায়, তার পরিবার সদ্য এসেছে এই দেশে, কথায় কথায় সে স্কুলের এক বান্ধবীকে জানাল যে প্রতি মাসে তার ভিতর থেকে রক্তপাত হয়, কেন হয় সে জানে না! মাঝে মাঝে প্রচণ্ড ব্যথা হয়, কিন্তু তার মা-কে এগুলো বলা স্বত্বেও মা শুধু বলেছিলেন বাড়ীতে শুয়ে থাকতে, ব্যথা সহ্য করতে, এবং গ্রহণযোগ্য কোন ব্যাখ্যা দেন নি এই স্বাভাবিক প্রাকৃতিক কর্মের! ফলে মেয়েটি ভুগছিল বিষণ্ণতায় এবং হীনমন্যতায়।

তার অভিজ্ঞতা শুনে মনে পড়ল বছর কয়েক আগে মধ্যরাতে আমার তাইওয়ানিজ বান্ধবী সুং ডর্মের দরজার করা নেড়ে বলেছিল তার ঋতুকালীন কিছু মেয়েলী সমস্যার কারণে প্রচণ্ড পেটব্যথা, যদি গাড়ী করে তাকে ঔষধের দোকানে নিয়ে যেতে পারি এই কারণে এসেছে সাহায্যের আশায়। প্রায় একই বয়সের দুই তরুণী কতটা ভিন্ন ভিন্ন ভাবে বেড়ে উঠেছে একই বিষয় নিয়ে সম্পূর্ণ উল্টো মানসিকতায়, একজন স্কুলের শিক্ষা থেকে জানে এটা স্বাভাবিক এবং প্রাকৃতিক, আরেকজন ভয় পাচ্ছে যদি এটি তার অপূর্ণতা বা অসুস্থতা হয়।

ছেলেদেরও বয়ঃসন্ধিকালীন সময়ের শুরু হওয়া ঘুমের মাঝে বীর্যপাতকে বলা হোত স্বপ্নদোষ! আরে বাবা একটা ১০০% প্রাকৃতিক কর্ম, এখানে দোষের কী আছে ! কিন্তু ঐ যে জ্ঞানের অভাব, সব বালক আমসি মুখে জানার, বোঝার চেষ্টা করে তার কী দোষ! সবজান্তা এক বন্ধু স্কাউট ক্যাম্পের তাবুতে বসে বলে সে শুনেছে আমরা ঘুমানোর সময়ে বেহেশতের পরীরা এসে যৌনকর্ম করে, যার ফলে আমাদের অজান্তেই থকথকে গাঢ় তরল বেরিয়ে আসে শরীর থেকে, যার স্পর্শে শূন্যে মিলিয়ে যায় পরীরা, এটা নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নাই! আরেক দল ততদিনে আবিস্কার করে ফেলেছে নিজের চাক নিজেরই ভেঙ্গে মধু আহরণের উপায়, তাদেরও জ্ঞান বড় ভাইয়ের দল থেকে প্রাপ্ত, এর বাহিরে কিছু জানে না, তার উপর চাক ভাঙ্গার সেই উপায়কে নিষেধ করা হয় সবখানে- ধর্মের বই থেকে, হাতুড়ে ডাক্তারের চেম্বারে, তাহলে কী উপায়!

আমার সবচেয়ে নিরীহ বন্ধুটা একদিন সরল মুখে অবলীলায় বলে ফেলল তার স্বপ্নদোষ হয় না ( তার মানে তুই ব্যপক মৈথুন করিস, নিজের বা অন্যের সাথে_?), আবার রাগের মাথায় বলে ফেলল – সে মৈথুনও করে না! তখন তাকে বোঝানো হল, এই দুইটা জিনিস একবারে হওয়া সম্ভব না, যে কোন একটা হতেই হবে যদি তুমি স্বাভাবিক সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হও। এ অনেকটা একটা ড্রামের মত যেখানে পাইপ দিয়ে তরল আসতেই আছে, ফলে নির্দিষ্ট সময় পরে উপচে পড়বেই, নাকি? ব্যাখ্যা শুনে ছোকরা অবশ্য রণে ভঙ্গ দিয়ে বলল সে ভেবেছিল এই দুটার একটাও স্বীকার করলে তার চরিত্রের স্থলন নিয়ে কথা উঠবে! অথচ বিদ্যুৎ মিত্রের সেই অমূল্য বইটাতে ঠিকই লেখা ছিল ব্রহ্মচর্যের বুলি শুনিয়ে তুমি সেই সময়ের চিত্তকে শান্ত করতে পারবে না, উপায় খুব বেশী নেই তোমার ঢাকগুড়গুড় সমাজে।

চাণক্য সেনের বিখ্যাত বই পুত্র পিতাকে বইয়ের সেই পুত্র কেতুর মত বাবা তো আর সবাই পাচ্ছে না যে কিনা ছবি এবং তথ্যসহ স্বাভাবিক যৌনতা নিয়ে শিক্ষা দেবে নিজ পুত্র-কন্যাকে, অথচ সেটাই অনেক কাজের কাজ হত, অনেক শোভন হত, অনেক কৈশোর দুঃস্বপ্ন থেকে রক্ষা পেত সব ছেলে-মেয়েরা, শাপশাপান্ত আর করতে হতে না সেই ইঁচড়েপাকা বন্ধুদের ভুল তথ্য দিয়ে জীবন বিষময় করে তোলার জন্য।

ফিনল্যান্ডের শিক্ষাব্যবস্থা টানা ৩ বছর বিশ্বের সবচেয়ে সেরা বলে স্বীকৃতি পেয়েছে ( কলেজ লেভেল পর্যন্ত), সেখানে খবর নিয়ে জানলাম বয়ঃসন্ধির আগেই ছেলে-মেয়েরা স্কুলে জ্ঞান লাভ করে সেই সময়ের শারীরিক পরিবর্তনগুলো নিয়ে। তারপরও যদি কারো বিশেষ সমস্যা হয়, বিশেষ করে হঠাৎ শিশুরা যখন সেক্স নিয়ে জানতে পারে তখন তাদের মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ে, তাদের মনে হয় আমার গুরুজনরা এমন কাজ করতে পারে কি, আমার শিক্ষকেরা?

নিশ্চয়ই না, কোথাও কোন ভুল হচ্ছে! আবার সঠিক তথ্য এবং সময়ের মাধ্যমেই জীবনরহস্য উদ্ঘাটিত হলে থিতিয়ে আসে ভুল আবেগের বহিঃপ্রকাশ। শিক্ষা ক্ষেত্রে উন্নত সকল দেশেই এই নীতিই গ্রহণ করা হয়, তাই ঘুরে ফিরে কেতুর কথাই মনে আসে, যখন সে বলে সেক্স নামের সেই দানবের ডালপালা কিন্তু আমরাই ছেঁটে দিয়েছি একে নিয়ে ব্যপক প্রচার এবং গবেষণার ফলে, একে নিয়ে আমরা কথা বলি, একে আমরা উম্মুক্ত রাখি নীতি বজায় রেখেই, একাকী আঁধারে আমার মনে পশুর মত হানা দেয় না সে, এটুকু উম্মুক্ত করতে পেরেছে যৌনতাকে আমাদের প্রজন্ম।

এখানে একটা মহাগুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার- শিশুটি যদি বড় হয়ে সমকামী অথবা উভকামী বা কামহীন হয়? হয়ত মনে আছে হুমায়ূন আহমেদের মিসির আলীর একটি বই (সম্ভবত আমি এবং আমরা)য়ের কেন্দ্রীয় চরিত্র তন্ময় নামের তরুণ ছিলেন বৃহন্নলা বা হিজড়া, কিন্তু তার এই প্রাকৃতিক কারণেই ছোটবেলায় নিজের মা তাকে মেরে ফেলতে চেষ্টা করে, ফলে হীনমন্যতাবোধ থেকে সে পরিণত হয় এক ভয়াবহ সিরিয়াল খুনিতে। এই মহা গুরুত্বপূর্ণবিষয়ে জ্ঞানদান করা বাল্যকাল থেকেই জরুরী, মহাজরুরী।

আমার সমকামী মেক্সিকান ভাই ইসাইয়াস সেরণাকে লিখেছিলাম, সে নিজেও আমার মতই রক্ষণশীল সমাজে বড় হয়েছে, কাউকে বলতে পারে নি যে সে একজন সমকামী, তার জৈবিক আকর্ষণ একজন সমলিঙ্গের প্রতি, সমকামিতা কোন অপরাধ নয় এটা প্রাকৃতিক ব্যাপার ( বেশী জানতে চাইলে অভিজিৎ রায়ের লেখা সমকামিতা বইটা পড়ে দেখতে পারেন), কিন্তু একজন সমকামী শিশু কী ভাবে বড় হয় আমাদের সমাজে? তার মানসিক জগত কতটা সুস্থ থাকে? এক বন্ধুর আত্মীয়কে দেখেছিলাম, ৫০ ছুঁই ছুঁই লোকটি কেঁদে ফেলেছিলেন বলতে বলতে যে উনি সমকামী, কিন্তু সমাজের চাপে বিয়ে করেছিলেন, ৩ সন্তানের জনক, কিন্তু নিজেও সুখ পেলেন না সারাজীবন, সবচেয়ে বড় কথা তার স্ত্রীও কোনদিন সুখ পেল না। এই সমাজ কী উপকারে আসল তার পরিবারের?

আরেকটা ব্যাপার দেখেছি অনেকেই গুলিয়ে ফেলে- সমকামিতা এবং শিশুকামিতা। সমকামিতা কোন অপরাধ নয়, কিন্তু শিশুকামিতা, শিশুর উপরে যৌনঅত্যাচার করা ভয়াবহ ধরনের অপরাধ। হুমায়ূন আহমেদের ঘেঁটুপুত্র কমলা দেখে অনেকেই সমকাম বা উভকামকে বিকৃত রুচির বলে চিহ্নিত করেছেন, কিন্তু মূল বিষয়টা হচ্ছে শিশুকাম, একজন শিশুকে সেখানে নির্মম ধর্ষণ করা হচ্ছে প্রতিনিয়ত। একজন শিশুকেই বেছে নিতে দেওয়া উচিত সে কী চায়, আপনি যদি ভ্যাটিকানের গির্জায়, তিব্বতের বৌদ্ধ গুম্ফায় বা বাংলাদেশের মাদ্রাসায় একজন অবুঝ শিশুকে নিপীড়ন করে যৌনতার ভুল শিক্ষা দেন, তার জীবন নষ্ট করে দেন অঙ্কুরেই- আপনার অপরাধ নরহত্যার সমতুল্য।

আর আমাদের সমাজে বিকৃত এই কামনার শিকারের সংখ্যা যে কত বেশী তার কোন লেখাজোখা নেই। বাংলাদেশের অধিকাংশ বন্ধুর ( ছেলে এবং মেয়ে) কাছেই শুনেছি শিশুকালে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে তারা নিজের অজান্তেই, এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিজের আত্মীয়ের কাছে। কেউ বেড়াতে এসেছে বাড়ীতে, দিলেন আপনার নিস্পাপ শিশুর সাথে এক বিছানায় থাকতে, হয়ত কেউ পশুর রূপে দিল তার দেহ –মনে আতংকের বীজ বুনে, যা সে কাউকে বলতে পারেনা, সারাজীবনই বয়ে চলে এক অদমনীয় আতংক নিয়ে। নিজের বাড়ন্ত শিশুকে অন্তত এটুকু শিক্ষা দিন যাতে কেউ অসভ্য ব্যবহার করার চেষ্টা করলে যেন যে বলে এটা করবা না, এটা খারাপ, তুমি পচা। এই শিক্ষা দিতে নিজের শিশুর কাছে লজ্জার কিছু নেই, হয়ত এটাই তাকে রক্ষা করবে ভয়াবহ কোন ঘটনা থেকে।

এখন পর্যন্ত আমাদের সমাজে যৌনতা অবদমনের সমাজ, তা চলছে সবখানে, অথচ এই নিয়ে কথা প্রকাশ্যে বলা নিষেধ ( জনসংখ্যা এই কারণেই মনে হয় লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ে!), যেটা ছিল সারাবিশ্বেই, এখন সময়ের সাথে প্রাপ্তজ্ঞানের মাধ্যমে পরিবর্তিত হচ্ছি আমরা আলোর দিকে, ভারতের মত রক্ষণশীল সমাজেও বিবাহপূর্ব লিভটুগেদার বৈধ বলে রায় দিয়েছে আদালত, আমাদের দেশেও বাড়ছে নিজের পছন্দ মত জীবনসঙ্গী বেছে নেবার প্রবণতা। কিন্তু আমরা যেন মনে রাখি যে আমাদের সারা জীবনের শেকড় কিন্তু প্রোথিত আছে আমাদের শৈশবে, সেই শৈশব যেন কিছু কদর্য মানুষের আক্রমণে, ভুলে মানুষের শিক্ষায় নষ্ট না হয়। যৌনতার যে তথ্যগুলো জানা থাকা অতি জরুরী তা যেন জানতে পারে আমাদের পরের প্রজন্ম বিদ্যালয়ে এবং বাড়ীতে, সঠিক সময়েই।



জনপ্রিয়